জেড আই পান্নার এ কেমন পুরস্কার?

- আপডেট সময় : ০৩:০৭:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০২৪ ৫৯ বার পড়া হয়েছে
নাদিম মাহমুদ: গত ২৬ ও ২৭ জুলাই নিরাপত্তার অজুহাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের ডিবিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরপর ২৮ জুলাই ওই সমন্বয়কদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে ভাত খাওয়ার কয়েকটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন তৎকালিন ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ। আর এই ছবি দেয়ার পর দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম শুরু হয়, তখন ওই সমন্বয়কদের মুক্তি ও আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি না চালানোর নির্দেশনা চেয়ে রিট করেন আইনজীবী মানজুর-আল-মতিন ও আইনুন্নাহার সিদ্দিকা। আর এই রিটের আইনজীবী ছিলেন জেষ্ঠ্য আইনজীবী জহিরুল ইসলাম খান পান্না বা জেড আই পান্না।
আমার স্পষ্ট মনে আছে রিটের শুনানির পর আদালতের বরাত দিয়ে জেড আই খান পান্না বলছিলেন, হাইকোর্ট বলেছে, সমন্বয়কদের খাইয়ে ছবি প্রকাশ জাতির সঙ্গে মশকরা করা হচ্ছে।
তিনি ওই সময় তার বলিষ্ঠ কণ্ঠে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, একাত্তর সালে দেখেছি পাক হানাদাররা রাতের বেলা ব্লক রেড দিয়ে খুঁজতো মুক্তিবাহিনী আছে কি না। আজ ২০২৪ সালে আমরা দেখলাম দরজায় দরজায় নক করে খোঁজ করছে ছাত্র আছে কি না? যদি ছাত্র থাকে তাহলে তাদের মোবাইল ফোন চেক করে। এটা কোন আইন আছে? তারা সীমা অতিক্রম করছে
তিনি আরো বলেন ‘আপনারা জানেন পাকিস্তান আমল ১৯৪৭ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত, ১৯৭১ সাল ছাড়া এত বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। স্বল্প সময়ে এত তরুণের আত্মাহুতির ঘটনা নেই। এই ভদ্রলোক বলছিলেন, আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশের সরাসরি গুলি করা এখনই বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে ব্লক রেইডের নামে গণগ্রেফতার।
এরপরই সমন্বয়কদের মুক্তি হয়। শুধু আদালতে রিট নয়, এরপর তারা গণতদন্ত কমিশন করেছেন, মানববন্ধন করছেন। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে লড়াই করা জেড আই খান পান্নাদের অবদান ভুলবার সুযোগ নেই।
কিন্তু আজ আমরা দেখলাম, কি এই ভদ্রলোকের নামেই গত ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় আহাদুল ইসলামকে গুলি ও মারধরের মাধ্যমে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করা হলো। ১৮০ জন আসামীর মধ্যে তার নামটিও খিলগাঁও থানায় ঢুকে দিয়েছেন আহাদুলের বাবা মো. বাকের (৫২)।
কি মহৎ কাজটিই না হয়ে গেল। আমার মনে হয়, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পক্ষে লড়া যতগুলো আইনজীবী আছেন, তার মধ্যে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি কিনা আন্দোলনে সমর্থন দেয়ার পুরস্কার হিসেবে কাঁধে ‘মামলা’ ঝুলিয়ে ফেললেন।
একই বলে ‘বাক স্বাধীনতা’। জেড আই খান পান্না বঙ্গবন্ধু বত্রিশ নম্বর বাসা পুড়িয়ে দেয়ার পর থেকে তার প্রতিক্রিয়া জানানো শুরু করেন। পনের আগস্ট উদযাপন না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সংবিধান বাতিল হলে দেশে যুদ্ধ লেগে যাবে এমন মন্তব্য করেন। এরপর বঙ্গবন্ধু ও একাত্তর মুছে ফেলা নিয়ে ‘রিসেট বাটন’ তত্ত্বে নিয়ে অন্তবর্তীকালিন সরকারের প্রধানকে উনি বাংলাদেশের অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য সাথে তুলনা করে তোপের মুখে পড়েন।
মনে রাখবেন, পান্নারা এই আন্দোলনের স্টেকহোল্ডার, আর আপনারাদের ক্ষমতার পথটি করে দিয়েছেন তারাই। আজ যদি পান্নাদের পুরস্কার হিসেবে ‘মামলা’ গলায় ঝুঁলিয়ে দেন, তাহলে তো আর কোন কথায় নেই। একজন গড়পড়তা মানের আইনজীবীর কণ্ঠস্বর সহ্য করার ক্ষমতা যদি না থাকে, তাহলে বৈষম্যহীন বাকস্বাধীনতার সমাজ বা রাষ্ট্র গড়বেন কীভাবে?
শেখ হাসিনা সরকার সমালোচনা সহ্য করতে পারত না, মামলা করে দিতো, কিন্তু আপনারা তাহলে কি করছেন? সত্য কথা বলা মানুষ এই সমাজের বোঝা। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালিন জেড আই খান পান্নারা থাকেন শত্রু হয়ে, আবার শেখ হাসিনাকে সরিয়েও পান্না থাকেন শত্রু হয়েই।
নিজেদের ভাল-মন্দ কাজের সমালোচনা সহ্য করার শক্তি সঞ্চয় করুন। সেটা করতে না পারলে দেখবেন, চারিদিকে কেবলই জেড আই খান পান্নারা। এই মিথ্যা মামলার প্রতিবাদ জানিয়ে রাখলাম।
লেখক:
সাংবাদিক ও গবেষক